টানা কয়েকদিন ধরে বাতাসে বারুদের গন্ধ। বাতাসে ভাসছে শত শত মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই গভীর রাতে হঠাৎ করেই পুরো দেশের মুঠোফোন ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ১৮ জুলাই রাতে দেশজুড়ে নেমে আসে সম্পূর্ণ ডিজিটাল অন্ধকার বা টোটাল ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। ফলস্বরূপ, ১৯ জুলাই সকাল থেকেই দেশের সাধারণ মানুষ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন বাইরের দুনিয়া থেকে। কোথায় কী ঘটছে, কার সন্তান গুলিতে লুটিয়ে পড়ছে, তার কোনো খবর পাওয়ার উপায় ছিল না। গণমাধ্যমের পাতায় পরে উঠে আসে সেই রুদ্ধশ্বাস ও নারকীয় সত্য—কেবল ১৯ জুলাই দিনটিতেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঝরে গেছে অন্তত ৫৬টি তাজা প্রাণ।
সেদিন ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধের দ্বিতীয় দিন। ঢাকার রামপুরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী এবং উত্তরা নিমেষেই পরিণত হয়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে। আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎকালীন অ্যাকশন ছিল নজিরবিহীন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সেদিন রাজধানীর আকাশে ওড়া হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, এই আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, পথচারী ও অভিভাবকেরা। রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্দোলনকে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দেয়। তোপখানা রোড, পল্টন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দফায় দফায় সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোটা রাজপথ।
একদিকে যখন রাজপথে বুলেটের শব্দ, অন্যদিকে তখন শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘সর্বস্তরের অভিভাবক সমাজ’ প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে যান। তাদের স্লোগান ছিল, “মৃত্যু এত সহজ কেন?: সন্তানের পাশে অভিভাবক”। পাশাপাশি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ছোট পর্দা ও মঞ্চের অভিনয়শিল্পীরাও মৌন প্রতিবাদ জানান। কিন্তু পর্দার আড়ালে তখন চলছিল আরেক ভিন্ন খেলা। ১৯ জুলাই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় আন্দোলনের সম্মুখসারির তিন মূল সমন্বয়ক—নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আবু বাকের মজুমদারকে। গভীর রাতে নন্দীপাড়া, মহানগর আবাসিক এলাকা ও ধানমন্ডি থেকে তাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ছাত্রসমাজে।
সব প্রতিকূলতা, ইন্টারনেট বন্ধ আর শীর্ষ নেতাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার পরও আন্দোলন দমানো যায়নি। ১৯ জুলাই রাত সাড়ে নয়টার দিকে এক ভিডিও বার্তায় তৎকালীন সমন্বয়ক আব্দুল কাদের সরকারের কাছে ৯ দফা দাবি পেশ করেন। যার মধ্যে অন্যতম ছিল শেখ হাসিনার প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং তিন মন্ত্রীর পদত্যাগ। এই ৯ দফা ঘোষণার পরই মূলত কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার পতন আন্দোলনের দিকে মোড় নেয়।
তথ্য অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো আন্দোলনকে যে दबाিয়ে রাখা যায় না, ১৯ জুলাইয়ের ঘটনা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ইন্টারনেট বন্ধ করে যখন একটা পুরো জাতিকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তখন মানুষের মনের ভয় ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়। তথ্যের অনুপস্থিতি মানুষের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক জেদ তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্র যখন জনগণের কণ্ঠরোধ করতে চায়, তখন জনতা নিজেই নিজের অধিকার আদায়ের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।