এক বুক স্বপ্ন আর পরিবারের মুখে অন্ন জোগানোর তাগিদ নিয়ে রাতে অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়েছিলেন ২৫ বছরের তরুণ রাজীব মিয়া। কিন্তু কে জানত, ঘাতকদের ধারালো অস্ত্রের কোপে সেই চাকা চিরতরে থমকে যাবে! ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানার চর ঈশ্বরদিয়া এলাকায় একদল দুর্বৃত্ত রাজীবকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি ছিনতাই করতেই এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে চর ঈশ্বরদিয়া এলাকার কাশেম ডাক্তারের কলাবাগানে এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে।
নিহত রাজীব মিয়া ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চর ঈশ্বরদিয়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানকান্দা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সন্ধ্যার পর প্রতিদিনের মতোই অটোরিকশা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন রাজীব। কিন্তু নিজের বাড়ি থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে চর ঈশ্বরদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাঁর ওপর চড়াও হয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় গ্রাম পুলিশের সদস্য স্বপন সরকার জানান, ঘটনাস্থলটি তাঁর বাড়ির খুব কাছেই ছিল। মাঝরাতে হঠাৎ বাঁচার আকুতি ও চিৎকার শুনে তিনিসহ প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘর থেকে দৌড়ে বের হন। সেই মুহূর্তে একটি অটোরিকশাকে তীব্র গতিতে পালিয়ে যেতে দেখলেও অন্ধকারের কারণে কাউকে চেনা সম্ভব হয়নি। এরপর কলাবাগানের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছেন রাজীব।
খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে রাজীবের মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠায়। সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নিহতের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়েছে, যার ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এ আর এম সাফায়েত ওসমান জানিয়েছেন, প্রাথমিক আলামত ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দেখে এটি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে এবং ছিনতাই হওয়া অটোরিকশাটি উদ্ধারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। এ ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
একটি অটোরিকশার জন্য একজন জলজ্যান্ত তরুণকে এভাবে খুন করার ঘটনা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার চরম ভঙ্গুর দশাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মাদকের টাকার জোগান দিতে কিংবা অতি দ্রুত অপরাধের মাধ্যমে ধনী হওয়ার মানসিকতা থেকে স্থানীয় ছোট ছোট অপরাধী চক্র এই ধরণের নৃশংস পথ বেছে নিচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলা নির্জন সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত টহল ও আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষের এই নিরাপত্তাহীনতা শুধু একটি পরিবারকে ধ্বংস করছে না, বরং পুরো সমাজকে এক ধরণের চরম ভীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই ধরণের জঘন্য অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে অপরাধীদের দুঃসাহস আরও বাড়বে বৈ কমবে না।