চলতি বিশ্বকাপের ফুটবল ম্যাচ দেখে মোটরসাইকেলে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর উত্তরা জসীমউদ্দীন এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে দুই সাংবাদিকের। নিহতরা হলেন— দৈনিক প্রাণের বাংলাদেশ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার রবিউল আলম রাজু এবং সংবাদ দিগন্তের রিপোর্টার সাকিবুল হাসান (শফিকুল)।
টঙ্গীর স্থানীয় সাংবাদিক আবুল হাসান জানান, নিহত সাকিবুল হাসান আসন্ন উত্তরা প্রেস ক্লাব নির্বাচনে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং রবিউল আলম রাজু সমাজকল্যাণ সম্পাদক পদের প্রার্থী ছিলেন। আগামী শনিবার (১৮ জুলাই) এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে এই অকালমৃত্যুতে সাংবাদিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে উপস্থিত দৈনিক কালের কণ্ঠের বরগুনার বামনা উপজেলা প্রতিনিধি মনোতোষ হালদার এক ফেসবুক পোস্টে এই হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি লিখেন:
”রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে আমি আমার এক নিকটাত্মীয়কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করাতে গিয়েছিলাম। ঠিক ওই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত দুজনকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ১০ মিনিটের মধ্যেই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তারা দুজনেই সাংবাদিক। ঘটনাস্থল থেকে তাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা দুই অপরিচিত যুবক জানান, জসীমউদ্দীন এলাকায় একটি দ্রুতগামী বাস তাদের মোটরসাইকেলটিকে সামনাসামনি ধাক্কা দিলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। তারা সম্ভবত সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের ম্যাচ দেখে উত্তরা থেকে বাসায় ফিরছিলেন।”
মনোতোষ হালদার তার পোস্টে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আরও উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনাস্থলের অদূরেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর ওই দুই যুবক তাদের ডাকলেও তারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেননি। পরে আনসার সদস্যদের সহায়তায় নিহতদের পকেট থেকে আইডি কার্ড বের করে পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পেছনে কোনো রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর। তিনি বলেন, “দুর্ঘটনাস্থলের কাছে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। এত বড় একটি ঘটনার পরও তারা কেন এগিয়ে এলেন না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত।”
প্রিয় সহকর্মীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন দৈনিক প্রাণের বাংলাদেশের সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন। গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা আমার জানা নেই। যে ছেলেটি দীর্ঘ ১২ বছর আমার সাথে সাংবাদিকতা করলো, গতকাল যার মোটরসাইকেলের পেছনে আমারও বসার কথা ছিল, সে আজ আর নেই। আমরা এভাবে কোনো অকালমৃত্যু চাই না। আল্লাহ তাদের জান্নাত নসিব করুন।”
এদিকে এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন খিলক্ষেত প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। শোকবার্তায় তিনি বলেন, “রবিউল আলম রাজু আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। উত্তরা এলাকায় গেলেই উনাকে ফোন না দিয়ে আমি আসতাম না। উনার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করেন।”
পুলিশ জানিয়েছে, ঘাতক বাসটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং লাশ দুটির ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া ও আইনি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।