রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসমরে সৈন্যদের মূল্যবান জীবন বাঁচাতে এবার রক্ত-মাংসের মানুষের জায়গা দখল করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত রোবট ও চালকবিহীন স্থলযান। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বিশেষ নির্দেশনায় ২০ Spark সালের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে অন্তত ৫০ হাজার ‘আনম্যান্ড গ্রাউন্ড ভেহিকেল’ বা ইউজিভি (UGV) নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উদ্ভাবন প্ল্যাটফর্ম ‘ব্রেভ১’ জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই ফ্রন্টলাইনে ব্যবহারের জন্য ২৫ হাজার রোবটযানের চুক্তি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ।
ইউক্রেনের ৩ নম্বর আর্মি কোরের কমান্ডার অ্যান্ড্রি বিলেটস্কি জানিয়েছেন, এই চালকবিহীন রোবটযানগুলো খুব দ্রুতই সম্মুখসমরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত সৈন্যের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে। কিয়েভ ইতিমধ্যে আকাশপথের ড্রোন এবং স্থলপথের রোবটযানের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সমন্বয় তৈরি করে ‘ড্রোন অ্যাসল্ট ইউনিট’ বা ড্রোন আক্রমণ দল গঠন করেছে। শুধু গত এপ্রিল মাসেই এই ইউক্রেনীয় রোবটযানগুলো ১০ হাজারের বেশি মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করেছে, যার বড় অংশই ছিল ফ্রন্টলাইনের বিপজ্জনক অবস্থানগুলোয় রসদ ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা।
###Target গুঁড়িয়ে দিচ্ছে এআই, মানুষের বদলে আগে যাচ্ছে মেশিন কোরিয়ার কেএসই ইনস্টিটিউট ও ব্রেভ১-এর যৌথ সমীক্ষা বলছে, ইউক্রেনের এই রোবটযানের বাজার আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। টেকনোলজি ইউনাইটেড ফর ইউক্রেনের প্রকৌশলীরা বলছেন, ড্রোন ও রোবটের যুগলবন্দি এখন যুদ্ধক্ষেত্রের মাটিকে মানুষের বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে। দূরনিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের (ট্যারেট) সাহায্যে রোবটগুলো একা একাই টহল দিতে ও শত্রুর অবস্থান গুঁড়িয়ে দিতে পারছে। গত ফেব্রুয়ারিতে কোনো পদাতিক সৈন্য না পাঠিয়ে, শুধু স্থলভাগের রোবট, কামিকাজে রোবটযান (যা শত্রুর গায়ে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়) ও স্ট্রাইক ড্রোন ব্যবহার করে কুপিয়ানস্কের কাছে একটি শক্তিশালী রুশ ঘাঁটি দখল করে ইউক্রেনীয় বাহিনী।
যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট নামানোর কাজটি অবশ্য সহজ নয়। ৩ নম্বর অ্যাসল্ট ব্রিগেডের সেনাসদস্য ডিমা জানান, রোবট ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শত্রুর সব ক্যামেরাযুক্ত এফপিভি (FPV) ড্রোন এটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ‘রাটেল রোবোটিকস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া ড্রোনগুলোকে মাঝ আকাশেই আটকে দেওয়ার জন্য গ্রাউন্ড রোবটে বসানো নেট লঞ্চার বা জাল নিক্ষেপকারী প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সক্ষম একটি রোবোটিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা উন্মোচন করা হয়েছে, যা কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই রাশিয়ার ‘শাহেদ’ কামিকাজে ড্রোনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে পারে। শত্রুর জ্যামিং এড়াতে ড্রোন ও রোবটের মধ্যে সিগন্যাল আদান-প্রদানে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক ‘মেশ নেটওয়ার্ক’ প্রযুক্তি।
রাশিয়াও কুরিয়ার, দেপেশা ও ইমপালসের মতো নিজস্ব রোবটযান সমান্তরালে মোদ্যন করলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ইউক্রেনের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। তবে রোবটের এই জয়জয়কারের মানে এই নয় যে রক্ত-মাংসের পদাতিক বাহিনী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের সামরিক বিশ্লেষক জর্জ বারোস মনে করিয়ে দেন, “রোবটগুলো সম্মুখ আক্রমণ জোরদার করতে পারলেও কোনো ভূখণ্ড পুরোপুরি দখল এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পুরোনো ধাঁচের পদাতিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা সব সময় থাকবে।” তবে নিউমো রোবোটিকসের ইউলিয়া ট্রিবুশনা বলেন, “একজন প্রকৃত সৈন্য হারানোর চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে চারটি মেশিন হারানো অনেক ভালো।” এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের এক আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের প্রাথমিক আভাস দিচ্ছে, যেখানে রোবটগুলো বুক চিতিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে আর রক্ত-মাংসের সেনারা থাকবে নিরাপদ দূরত্বে।b