নিজস্ব প্রতিবেদক:
মানিকগঞ্জ পৌরসভায় উন্নয়নমূলক কাজের বিল পেতে ঠিকাদারদের চরম হয়রানি ও প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বকেয়া বিলের চেক সই করতে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি এবং দাবি পূরণ না হওয়ায় দাপ্তরিক নথি ছিঁড়ে ফেলার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন নামে। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী এক ঠিকাদারের ছেলে জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর পুরো জেলায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
বাবার মৃত্যুর পর বিল পেতে ছেলের করুণ আকুতি
ভুক্তভোগী রুবেল জানান, তার বাবা কিতাব আলী পৌরসভার তালিকাভুক্ত একজন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার ছিলেন। ছয় মাস আগে তার মৃত্যুর পর ১০ কোটি ১০ লাখ টাকার পাঁচটি প্রকল্পের বকেয়া বিল তুলতে গিয়ে রুবেল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ফাইল খুঁজে বের করতেই তাকে দপ্তরের কর্মচারীদের ২-৩ হাজার টাকা করে ‘বখশিস’ দিতে হয়েছে।
এরপর মূল ফাইলের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন সরাসরি এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। রুবেল বলেন, “আমি নিরুপায় হয়ে মাস্টাররোল কর্মচারী শাকিলের মাধ্যমে প্রথমে ২০ হাজার এবং পরে ৩০ হাজার টাকা দিই। কিন্তু বাকি টাকার জন্য আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে প্রকৌশলী আমার বাবার শ্রমের কার্যাদেশ (Work Order) ছিঁড়ে ফেলেন।”
৭ শতাংশের ‘ওপেন সিক্রেট’ সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানিকগঞ্জ পৌরসভায় বিল পাসের ক্ষেত্রে শতকরা ৭ ভাগ ঘুষ দেওয়া এখন একটি ‘অলিখিত নিয়মে’ পরিণত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, এই ৭ শতাংশ টাকা না দিলে কোনো ফাইলের চাকা ঘোরে না। এই টাকার ভাগ নিচের স্তরের কর্মচারী থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পকেটেও যায় বলে গুঞ্জন রয়েছে। মেসার্স রাফি ও রিকা নামক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আল রাফি জানান, তার প্রায় এক কোটি টাকার বিল আটকে আছে কেবল অগ্রিম টাকা না দেওয়ার কারণে। এর ফলে অনেক চলমান উন্নয়নমূলক কাজও বন্ধ হয়ে পড়েছে।
প্রশাসনিক অপরাধ ও দুর্নীতির চালচিত্র
সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনায় প্রধানত চারটি ধারায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে:
চাঁদাবাজি ও ঘুষ: দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ অনুযায়ী সরকারি কাজের বিল আটকে টাকা দাবি করা সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ।
সরকারি নথি বিনষ্টকরণ: ফাইলের গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বা কার্যাদেশ ছিঁড়ে ফেলা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯-এর পরিপন্থী এবং দণ্ডবিধির অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
ক্ষমতার অপব্যবহার: ব্যক্তিগত আক্রোশে কোনো নাগরিককে সরকারি দপ্তরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।
প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট: শাকিলের মতো মাস্টাররোল কর্মচারীদের লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির চক্রের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।
অভিযুক্ত ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন বরাবরের মতোই আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, “ফাইলে কার্যাদেশ না থাকায় আমি সই করিনি। ঘুষের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।” তবে কেন নথি ছেঁড়া হলো বা কেন ঠিকাদারকে প্রবেশে নিষেধ করা হলো—সে বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি।
পৌর প্রশাসক জয়া মারিয়া পেরেরা কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সরকারি দপ্তরে অনিয়মের কোনো ঠাঁই নেই। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুতই একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। প্রমাণ মিললে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”