পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা দাবির যৌক্তিকতা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

বিশেষ নিবন্ধ:
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে রাজপথে নেমে আসা, মহাসড়ক অবরোধ এবং কারখানা ছুটির মতো ঘটনাগুলো দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের এক গভীর সংকটের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে শ্রমিকদের দাবি কি খুব বেশি বা অবাস্তব? কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং একজন শ্রমিকের পাক্ষিক ও মাসিক হিসাব কষলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তাঁরা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তা চাইছেন।
টানা সাড়ে চার বছর ধরে কমছে প্রকৃত আয়
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হওয়ার পর থেকে বিশ্ব পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-সংকট এবং ডলারের দরপতনের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অথচ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে টানা মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বেতনে প্রতি ১ টাকা বৃদ্ধির বিপরীতে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে ৩ টাকা। একজন পোশাক শ্রমিকের ৪ সদস্যের পরিবারের অতিপ্রয়োজনীয় মাসিক খরচ (খাদ্য, চিকিৎসা, বাসা ভাড়া ইত্যাদি) মেটাতে যেখানে অন্তত ২১ হাজার টাকা প্রয়োজন, সেখানে ওভারটাইম মিলিয়ে তাঁর মাসিক আয় বড়জোর ১৬ হাজার টাকা। ফলে প্রতি মাসেই তাঁকে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে অথবা খাবার কমিয়ে দিতে হচ্ছে। কাগজে-কলমে বেতন কিছুটা বাড়লেও টাকার মান কমে যাওয়ায় প্রকৃত অর্থে শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনমান কেবল নিচেই নেমেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও জীবনধারণ মজুরি (Living Wage)
গ্লোবাল লিভিং ওয়েজ কোয়ালিশনের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার চার সদস্যের একটি পরিবারে একজন শ্রমিকের জীবনধারণ মজুরি বা লিভিং ওয়েজ হওয়া উচিত মাসে ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা। অর্থাৎ শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার যে দাবি, তা কোনো আকাশছোঁয়া আবদার নয়; বরং আন্তর্জাতিক গবেষণার হিসাবের সঙ্গেই এটি হুবহু মিলে যায়।
আইএলওর ন্যূনতম মজুরি কনভেনশন ১৩১ অনুযায়ী, মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী সিবোম রাউনট্রি এবং পরবর্তীতে রিচার্ড ও মার্থা আঙ্কারের গবেষণায় এটি প্রমাণিত যে, শ্রমিকের মজুরি হতে হবে এমন, যা তাঁকে পরিবারসহ মানবিক জীবনযাপন করার সুযোগ দেয়।
‘বেশি মজুরি দিলে কারখানা চলবে না’—এই ধারণার ইতি টানতে হবে
অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে মজুরি বাড়ালে কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে আধুনিক অর্থনীতি তা বলে না। অর্থনীতিবিদ জর্জ আকারলফ, জোসেফ স্টিগলিৎস এবং নোবেলজয়ী ডেভিড কার্ডের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ন্যায্য মজুরি পেলে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ে, চাকরি ছেড়ে যাওয়ার হার কমে এবং সামগ্রিক কর্মসংস্থানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।
বাজার অর্থনীতির জনক অ্যাডাম স্মিথও তাঁর ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’-এ উল্লেখ করেছেন যে, শ্রমিকের মজুরি অন্তত এতটুকু হওয়া উচিত, যাতে সে নিজেকে ও তার পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে পারে। চার দশকে দেশের পোশাক খাত কোটি কোটি ডলারের সাম্রাজ্য গড়ে তুললেও সেই সমৃদ্ধির সুফল যে সমাজের সবচেয়ে নিচুতলার মানুষটির কাছে পৌঁছায়নি, চলমান শ্রমিক অসন্তোষ তারই নির্মম প্রমাণ। তাই কৃত্রিম রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র না খুঁজে, শ্রমিকদের বেঁচে থাকার এই মৌলিক অধিকারকে সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।