বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাবনা ও করণীয়

দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম, লোডশেডিং ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা জনজীবন ও অর্থনীতিতে যে গভীর চাপ তৈরি করছে, তা কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাকে দ্রুত সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া দেশে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধানের একটি। সরকারি-বেসরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে স্টেশনসহ অসংখ্য স্থাপনার ছাদ ও খোলা জায়গা এখনো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়নি। সরকার চাইলে একটি সময়বদ্ধ জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে।
সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ
প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশের সব সরকারি অফিস-আদালত ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বড় বাণিজ্যিক ভবনগুলোকে এই কর্মসূচির আওтаভুক্ত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু নতুন সোলার প্যানেল স্থাপনই নয়, বরং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অন-গ্রিড (on-grid) সৌরবিদ্যুৎ এবং দক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এর ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যুৎ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
‘সবার জন্য সৌরবিদ্যুৎ’ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নয়, সাধারণ জনগণকেও এই কর্মসূচির অন্যতম অংশীদার করতে হবে। সরকার চাইলে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য সহজ শর্তে, প্রয়োজনে সুদমুক্ত বা অত্যন্ত স্বল্পসুদের অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। বাড়ির ছাদ বা উপযুক্ত স্থানে সোলার প্যানেল স্থাপনের ব্যয় পরিবারগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ভর্তুকি এবং সচ্ছল পরিবারের জন্য ঋণভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে একটি ‘সবার জন্য সৌরবিদ্যুৎ’ জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা সম্ভব।
রেলওয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা
দেশের ৩০০-এর বেশি রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, লঞ্চ টার্মিনালের শেড এবং রেলওয়ের বিভিন্ন কার্যালয় ও ওয়ার্কশপের ছাদ পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি, হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের ছাদগুলো কাজে লাগালে সম্মিলিতভাবে বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারে। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে হাতে-কলমে শেখার একটি বড় ক্ষেত্র তৈরি করবে। এছাড়া দেশের মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছাদগুলোতেও ছোট ও মাঝারি আকারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যেতে পারে।
জাতীয় ‘রুটপ সোলার মিশন’ ও সমন্বিত পরিকল্পনা
সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুৎ সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে না দেখে একে মূল গ্রিডের একটি শক্তিশালী সহায়ক উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে নিম্নমানের সোলার প্যানেল বা অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান রোধে শক্তিশালী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য ছাদ ও স্থাপনার ডিজিটাল তালিকা তৈরি করে ‘জাতীয় রুটপ সোলার মিশন’ বা একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
বিদ্যুৎ সংকট কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি জড়িত। তাই খালি পড়ে থাকা প্রতিটি ছাদকে যদি ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তর করা যায়, তবে আগামী দিনের সংকট মোকাবিলায় তা আমাদের অন্যতম বড় শক্তিতে পরিণত হবে।
লেখক: চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।