চট্টগ্রাম সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের চাঁদাবাজির কৌশল জিইসি মোড়ের ইউসুফ সিন্ডিকেট

গাজী ফিরোজ:
চট্টগ্রাম
“ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, নয়তো বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্যই এই পথ বেছে নিয়েছি”—সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের সন্ত্রাসী খাতায় নাম লেখানোর কারণ হিসেবে এভাবেই দম্ভোক্তি করেছিলেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ‘ডেভিড ইমন’। গত বুধবার যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিন সহযোগীসহ পুলিশি জালে ধরা পড়া ইমনের চাঁদাবাজির ভয়ংকর নেটওয়ার্ক ও রিমোট-কন্ট্রোল অপরাধের চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে।
পরিবার-সন্তানদের বায়োডাটা সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ইমনের এলাকাভিত্তিক গোপন সোর্স ছিল। কোনো ব্যবসায়ী বা প্রবাসীকে টার্গেট করার পর তাঁর আয়ের উৎস, ব্যাংকের তথ্য, নির্মাণাধীন ভবনের হিসাব এবং তাঁর সন্তানরা কোথায় কোন স্কুলে পড়ে বা কোথায় চলাফেরা করে—তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করত ইমনের ‘তথ্য সংগ্রাহক’ দল। এরপরই ইমন নিজে বিদেশি কোনো হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে ফোন করে কয়েক লাখ থেকে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করতেন। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে সন্তানকে হত্যা কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলি ও হামলার হুমকি দিতেন তিনি।
সিএনজি অটোরিকশায় নগদ চাঁদা আদায় ও জিইসি মোড়ের ‘ইউসুফ চেইন’
ইমন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে কৌশলে ব্যাংকিং লেনদেন এড়িয়ে সরাসরি নগদে বাহকের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করতেন। দক্ষিণ পাহাড়তলীর এক ব্যবসায়ী জানান, তাঁর ছেলের জীবনের বিনিময়ে অনুনয়-বিনয় করে ২০ লাখ থেকে কমিয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারিত হলে, সিএনজি অটোরিকশা চেপে ইমনের দুই তরুণ সহযোগী এসে বাসার সামনে থেকে ব্যাগভর্তি নগদ টাকা নিয়ে সটকে পড়ে। পুলিশ জানায়, নগর ও জেলাজুড়ে সংগৃহীত এসব কোটি কোটি টাকার নগদ চাঁদা জমা হতো নগরের জিইসি মোড়ের একটি রেস্টুরেন্টে ইউসুফ নামের এক ব্যক্তির কাছে। সেখান থেকে ইউসুফ সেই টাকা হুন্ডি ও নির্দিষ্ট ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে অবস্থানরত ইমনের কাছে পাঠিয়ে দিতেন।
ক্রিকেটার থেকে 'বড় সাজ্জাদের' প্রধান শুটার
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর গ্রামের বাসিন্দা ইমন ছোটবেলায় ক্রিকেট অনুশীলনে সাইকেল চালিয়ে চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে যেতেন। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদের’ বাহিনীর সাথে যুক্ত হন। বড় সাজ্জাদের অন্য সহযোগী ‘ছোট সাজ্জাদ’ কারাগারে যাওয়ার পর বাহিনীর অন্তত ৫০ জন শুটারকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান ইমন ও তাঁর সঙ্গী মো. রায়হান। ইমনের বিরুদ্ধে বাকলিয়ার জোড়া খুন ও পতেঙ্গায় ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যাসহ ১৫টি মামলা রয়েছে।
ইউসুফকে খুঁজছে পুলিশ, রিমান্ডের প্রস্তুতি
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম এবং অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ জানান, ইমনের পুরো গ্যাংটি তিনটি আলাদা টিমে বিভক্ত ছিল—একটি দল তথ্য সংগ্রহ করত, দ্বিতীয় দল নগদ চাঁদার টাকা সংগ্রহ করত এবং তৃতীয় দল হামলা বা গুলি চালাত। ইমনের চাঁদার টাকা হুন্ডিতে পাচার করা মূল কারিগর ইউসুফকে ধরতে জোর অভিযান চলছে। বৃহস্পতিবার ইমনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুতই তাঁকে রিমান্ডে এনে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।