জুলাই গণহত্যার বিচার বানচালের চক্রান্ত: ফজলে করিমের পরিবার ও চক্রের বিরুদ্ধে সাক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকি

নিজস্ব প্রতিবেদক:
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে সংঘটিত গণহত্যার বিচার ভেস্তে দিতে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার এক নজিরবিহীন নীল নকশা বাস্তবায়ন করছেন সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবার ও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি চক্র। মূল আসামি ফজলে করিমসহ প্রভাবশালী আসামিদের আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বের করে আনতে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে দিয়ে বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট প্রকাশ, নগর আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের ওপর দায় চাপানো, বিদেশে বসে দেশ অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত এবং সাক্ষীদের পরিবারসহ সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
ডেভিড বার্গম্যানকে দিয়ে বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট ও দায় চাপানোর চক্রান্ত
“জুলাই হত্যাকাণ্ডে ফজলে করিমের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না”—এমন একটি ভিত্তিহীন তথ্য প্রতিষ্ঠিত করতে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে দিয়ে প্রতিবেদন করাচ্ছেন ফজলে করিমের আইনজীবী ও সাবেক স্ত্রী ব্যারিস্টার রিজওয়ানা ইউসুফ—এমন অভিযোগ তুলেছেন অভিযুক্তরা। এর মূল উদ্দেশ্য, চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের নেতা আ. জ. ম. নাছির উদ্দীন ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে দিয়ে মূল গডফাদার ও মাস্টারমাইন্ড ফজলে করিমকে নিষ্কৃতি দেওয়া।
অথচ আন্দোলন চলাকালীন ভেতরের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। সে সময় আ. জ. ম. নাছির ও নওফেল শিক্ষার্থীদের সাথে বসে একটি সমঝোতায় যেতে চাইলেও খোদ ফজলে করিমের চরম জোড়াজুড়ির কারণেই তা সম্ভব হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফজলে করিম প্রকাশ্যে বলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী চাইলে চট্টগ্রামকে পাহারা দিতে পারে রাউজানবাসী।” মূলত নাছির ও নওফেলকে সরিয়ে চট্টগ্রামের রাজনীতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতেই রাউজান থেকে সন্ত্রাসী এনে ছাত্র-জনতার ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা চালিয়েছিলেন এই সাবেক এমপি।
বিদেশে বসে নিয়ন্ত্রণ ও সাক্ষীদের প্রাণনাশের হুমকি
বর্তমানে বিদেশে বসে মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো আন্তর্জাতিক আওয়ামী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন ফজলে করিমের ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বায়েজিদ লিংক রোড এলাকা থেকে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টাকালে গ্রেফতার হওয়া ৪ ব্যক্তির সবাই রাউজানের বাসিন্দা হওয়ায় এই চক্রান্তের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মামলার অন্যতম সাক্ষী সম্রাট রোবায়েত, আনিস আহমেদ এবং ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি রেজাউল করিম জানান, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া তাঁদের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ও ঠিকানা রহস্যজনকভাবে ফাঁস হয়ে গেছে। এরপর থেকেই দুবাই ও জর্ডানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে অনবরত প্রাণনাশের হুমকি এবং কোটি টাকার প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে। সাক্ষীদের এবং তাঁদের মা-বাবার ছবি বিকৃত করে ‘মেরে ফেলা হবে’ লিখে রাতের অন্ধকারে এলাকায় এলাকায় পোস্টারিংও করা হচ্ছে। বিদেশে বসে এই পুরো চক্রটি পরিচালনা করছেন ফারাজ করিম চৌধুরী ও তাঁর পিএস সাইদুল ইসলাম। আর তাদের নেপথ্যে আইনি ও কৌশলগত পরামর্শ দিচ্ছেন ফারাজের মা ব্যারিস্টার রিজওয়ানা ইউসুফ। তবে সমস্ত হুমকি ও প্রলোভন উপেক্ষা করে ট্রাইব্যুনালে সত্য সাক্ষ্য দেওয়া থেকে একচুলও পিছপা হবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন সাক্ষীরা।
মেডিকেল রিপোর্ট জালিয়াতি ও বিচার ব্যবস্থার ভাবমূর্তি নষ্টের অপচেষ্টা
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ফজলে করিম চৌধুরীর শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে একটি বিশেষ মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে তাঁকে ‘গুরুতর অসুস্থ’ দেখিয়ে জামিন আদায়ের অপচেষ্টা চলছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরীণ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের আংশিক অডিও রেকর্ড বিকৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে বিচার ব্যবস্থার ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্তও অব্যাহত রয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য ও শহীদ পরিবারের হুঁশিয়ারি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, সাক্ষীদের সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কড়া লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, “কোনো ধরনের অপপ্রচার, মিডিয়া ট্রায়াল, হুমকি বা চক্রান্ত দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে থামানো যাবে না।”
এদিকে ছাত্র-জনতা ও শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, জুলাই গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ফজলে করিম চৌধুরী যদি কোনো রাজনৈতিক বা আইনি সিন্ডিকেটের যোগসাজশে পার পেয়ে যান, তবে তা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এই বিচার বানচালের চেষ্টা করা হলে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আবারও এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও গণবিস্ফোরণ ঘটে যাবে।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।