মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
অপরাধ উন্মোচন
duniti

মিরপুর ভূমি অফিস যেন দালাল ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের স্বর্গরাজ্য ফাইল আটকে প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য সেবাগ্রহীতারা

২০-০৭-২০২৬
4
মিরপুর ভূমি অফিস যেন দালাল ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের স্বর্গরাজ্য ফাইল আটকে প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য সেবাগ্রহীতারা

​নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:

ঢাকার মিরপুর রাজস্ব সার্কেল (ভূমি সহকারী কমিশনারের কার্যালয়) এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের সরাসরি যোগসাজশে পুরো কার্যালয় নিয়ন্ত্রণ করছে একটি শক্তিশালী বহিরাগত দালাল সিন্ডিকেট। টাকা ছাড়া এখানে কোনো ফাইল নড়ে না, আর দালাল ছাড়া মেলে না কোনো বৈধ সেবা। বিশেষ করে নামজারি বাতিল বা সংশোধনের জন্য দায়ের করা 'মিস কেস' (বিবিধ মামলা) ও পর্চা সংক্রান্ত জটিলতা সমাধান করতে এসে সাধারণ মানুষ চরম হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।

​কর্মকর্তা ও দালাল সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই কার্যালয়ের দুই প্রভাবশালী স্তম্ভ—সার্ভেয়ার মো. কামাল হোসেন ও ক্যাশিয়ার কাম নাজির আব্দুস সালাম। অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় অফিসের ভেতরে ও বাইরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে এস এম মুস্তফাসহ একটি প্রভাবশালী বহিরাগত দালাল চক্র। ভুক্তভোগীদের দাবি, নাজির আব্দুস সালাম ও সার্ভেয়ার কামালের নির্ধারিত 'রেট' অনুযায়ী এই বহিরাগত দালালদের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা রফা-দফা না হওয়া পর্যন্ত ফাইলের ওপর কোনো সই পড়ে না।

​কোনো নাগরিক নিজের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে হাজির হলেও ফাইলে কাল্পনিক ত্রুটি বা ভুল ধরিয়ে দিয়ে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। বিশেষ করে জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ বা নামজারি সংশোধনের জন্য যখন কোনো ভুক্তভোগী ‘মিস কেস’ দায়ের করেন, তখন এই চক্রটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তারা একপক্ষের রায় অন্যপক্ষের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার তদবির করে। অফিসের নথিপত্র সাধারণ কর্মচারীদের চেয়ে এই বহিরাগত দালালদের হাতেই বেশি দেখা যায় বলে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা অভিযোগ করেছেন।

​সিসিটিভি ক্যামেরার সামনেই ধূমপান, ক্ষুব্ধ সেবাগ্রহীতারা

​সম্প্রতি office কক্ষে বসে সরকারি কর্মকর্তা সার্ভেয়ার মো. কামাল হোসেনের প্রকাশ্যে ধূমপান করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে লাখ লাখ টাকার মূল্যবান ও স্পর্শকাতর সরকারি নথিপত্র সংরক্ষিত থাকে, সেখানে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। একই সাথে এটি সরকারি অফিসে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করছে।

​দালালদের খপ্পরে মূল্যবান সব মৌজা

​মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের অধীনস্থ মৌজাগুলোর জমির মূল্য ও চাহিদা বেশি থাকায় দালাল চক্রের নজরও এই এলাকাগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি। এই সার্কেলের আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ মৌজাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

​মিরপুর ও পল্লবী মৌজা

​সেনপাড়া পর্বতা ও শেওড়াপাড়া মৌজা

​কাফরুল, পীরেরবাগ ও বড়বাগ মৌজা

​দিয়াবাড়ী ও জোয়ার সাহারা (আংশিক) সংলগ্ন এলাকা

​সরেজমিনে দেখা গেছে, এই মৌজাগুলোর খাস জমি, অর্পিত সম্পত্তি কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ভুয়া রেকর্ড ও জাল নামজারি তৈরিতে এই সিন্ডিকেট পর্দার আড়াল থেকে মূল ভূমিকা পালন করছে। সেনপাড়া পর্বতা বা দিয়াবাড়ীর মতো মূল্যবান এলাকার জমি নিয়ে হওয়া মিস কেসগুলোই এই চক্রের আয়ের প্রধান উৎস।

​সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

​ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার বাবার নামের একটি নামজারি সংশোধনের জন্য মিস কেস করেছি প্রায় এক বছর আগে। কিন্তু দালাল চক্রকে টাকা না দেওয়ায় প্রতি শুনানিতেই কোনো না কোনো অজহাতে সময় পার করে দেওয়া হচ্ছে। এরা অফিসের কেউ না হয়েও সরকারি ফাইলের ভেতর হাত দেয় কীভাবে?"

​এই সীমাহীন দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে মিরপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড জনাব মো. বায়েজিদ সরদারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। কর্মকর্তার এই নীরবতা নিয়ে জনমনে নানা গুঞ্জন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

​তবে এ বিষয়ে সরাসরি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে জানান, "সরকারি কার্যালয়ে বসে ধূমপান কিংবা সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানি করার কোনো সুযোগ নেই। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত ঘুষ বাণিজ্য, ফাইল আটক ও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দ্রুত কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

​ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে যখন প্রতিটি সরকারি দপ্তরকে দুর্নীতিমুক্ত করার জোর প্রচেষ্টা চলছে, তখন মিরপুর ভূমি অফিসের এই প্রকাশ্য লুটপাট ও সিন্ডিকেট ভাঙতে অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজ।

​(মিরপুর ভূমি অফিসের এই সিন্ডিকেটের বেনামী সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য জানতে চোখ রাখুন পরবর্তী পর্বে...

— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

মোট ০ প্রতিক্রিয়া

প্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।

প্রকাশক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অপরাধ উন্মোচন
নিউজলেটার

দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান

যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য ()

মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।