অপুষ্টি ও টিকাহীনতায় দেশে হামের মহামারি

নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে প্রতিনিয়ত আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব। আর এই পরিস্থিতির জন্য কেবল ভাইরাসের সংক্রমণ নয়, বরং শিশুদের পুষ্টিহীনতা এবং টিকাদান কর্মসূচির চরম অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৬৫ শতাংশই মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছে। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের নমুনা পরীক্ষায় প্রায় ৯৫ শতাংশের শরীরেই হাম শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণায় বেরিয়ে এল অপুষ্টি ও মায়ের দুধের করুণ চিত্র
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গত মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে চিকিৎসা নিতে আসা ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৫৪ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা পরিচালিত হয়। আইসিডিডিআরবি ল্যাবরেটরিতে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা ও জিন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫ বছরের কম বয়সী ৩০৮ জন শিশুর মধ্যে ১২ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টি এবং ৫৩ শতাংশ শিশু মাঝারি ধরনের অপুষ্টিতে আক্রান্ত।
গবেষণায় মায়ের দুধ ও শিশু সুরক্ষার নিবিড় সম্পর্কও স্পষ্ট হয়েছে। দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৩৮ শতাংশই নিয়মিত মায়ের দুধ পায়নি। এমনকি চিকিৎসা নিতে গিয়ে যে ১১ জন শিশু মারা গেছে, তাদের মধ্যে ৯ জনই (৮২ শতাংশ) প্রথম ছয় মাস কেবল মায়ের দুধ পাওয়ার সুফল থেকে বঞ্চিত ছিল।
টিকার বাইরে বড় জনগোষ্ঠী, ৪০% পদ ফাঁকা
টিকা সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও শিশুরা সুরক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। গবেষকেরা ৩৪২ জন শিশুর তথ্যে দেখেছেন, ৪৩ শতাংশ শিশু বয়সের কারণে টিকার আওতার বাইরে ছিল (বয়স ৯ মাসের কম)। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বয়স হওয়ার পরও ৩৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকার মুখই দেখেনি। আর মাত্র ৬ শতাংশ শিশু টিকার পুরো দুই ডোজ সম্পন্ন করেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত স্বীকার করেন যে, দেশ এখন হামের মহামারির কবলে পড়েছে। তিনি বলেন, “হাম থামাতে টিকা ছাড়া কোনো পথ নেই। কিন্তু মাঠে ৪০ হাজার পদের বিপরীতে জনবল আছে মাত্র ২৫ হাজার। প্রায় ৪০ শতাংশ পদ খালি রেখে সবাইকে টিকাদান অসম্ভব। বহুমাত্রিক ব্যর্থতায় আজ এই পরিস্থিতি। কোনো ‘ম্যাজিক বুলেট’ দিয়ে এটা রাতারাতি ঠিক করা যাবে না, নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্তত দুই-তিন মাস লাগবে।”
ভাইরাসের ধরন বনাম প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা
গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ছড়ানো হামের ভাইরাসটি মূলত 'বি৩' (B3) ধরনের, যাতে বিশেষ কোনো রূপান্তরিত পরিবর্তন আসেনি যে এটি অতিরিক্ত সংক্রামক হয়ে উঠবে। অর্থাৎ, ভাইরাস শক্তিশালী হওয়ার চেয়ে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও পুষ্টি সচেতনতার দুর্বলতাই এই মহামারির মূল কারণ। শিশু ছয় মাস বয়সে পৌঁছালে মায়ের দেওয়া প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা শূন্যে নেমে আসে। তাই ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ দেওয়ার আগপর্যন্ত সময়টিতে শিশুর পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। একইসাথে টিকাদানের মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট দূর না করলে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।