মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
অপরাধ উন্মোচন
nationwide

কেউ সন্তানকে এনে দিলে ভিটেবাড়ি দিয়ে দেব’: রাজধানীতে ৪০টি নিখোঁজ শিশুর পরিবারের আকুতি

৬-০৯-২০২৬
4
কেউ সন্তানকে এনে দিলে ভিটেবাড়ি দিয়ে দেব’: রাজধানীতে ৪০টি নিখোঁজ শিশুর পরিবারের আকুতি
ডিআরইউ মিলনায়তনে বোর্ডে ঝুলানো নিখোঁজ শিশুদের ছবির ভিড়ে নিজের সন্তানের সন্ধানে কাঁদছেন এক হতভাগ্য পিতা।

“আপনারা কি কেউ আমার মেয়েকে দেখেছেন? গ্রামে একটা ভিটেবাড়ি আছে, কেউ এনে দিলে পুরস্কার হিসেবে সেটাও দিয়ে দেব!”—ডায়াসে দাঁড়িয়ে চোখ ভাসিয়ে এভাবেই নিখোঁজ মেয়ের জন্য আকুতি জানাচ্ছিলেন মা স্বপ্না আক্তার। এক বছর আগে রাজধানীর পল্লবী থেকে তিন বছরের মেয়ে রূপা নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তির ঘুম ঘুমাতে পারেননি তিনি। কেবল স্বপ্না আক্তারই নন, তাঁর মতো আরও ৪০টি পরিবারের মা-বাবা রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে জড়ো হয়েছিলেন একটাই প্রশ্ন নিয়ে—‘আমার সন্তান কোথায়?’ বুকভাঙা কষ্ট আর হারিয়ে যাওয়া সন্তানের ছবি হাতে মা-বাবাদের করুণ আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন পরিবেশ।

ছবি হাতে প্ল্যাকার্ড ও ৭ মাসে ২ হাজার শিশু নিখোঁজ

'জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের' সহযোগিতায় আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে আসা প্রতিটি পরিবারের হাতে ছিল হারিয়ে যাওয়া সন্তানের ছবিসহ প্ল্যাকার্ড। কারও প্ল্যাকার্ডে লেখা '৮ দিন ধরে নিখোঁজ', কারওটায় ৩৭০ দিন, আবার কারওটায় লেখা ছিল '৬,৫৫৩ দিন ধরে সন্তান নিখোঁজ'। পুলিশ সদর দপ্তরের এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই দেশে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের অভিযোগে জিডি হয়েছে। যার মধ্যে অন্যেরা উদ্ধার হলেও এখনও ২ হাজার ৩৮ জন শিশু সম্পূর্ণ নিখোঁজ রয়েছে, যাদের কোনো হদিস মিলেনি।

চোখের পানিতে মিশে থাকা কিছু হৃদয়বিদারক গল্প

অনুষ্ঠানে আসা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল নজরুল ইসলাম তাঁর সপ্তম শ্রেণিতে পড়া ছেলে তামিমের ছবি দেখিয়ে কাঁদছিলেন। ছেলেকে ফিরে পেতে কবিরাজ থেকে শুরু করে এমন কোনো পথ নেই যেখানে তিনি যাননি। অন্যদিকে, আড়াই বছর আগে নিখোঁজ হওয়া সামিয়ার মা চম্পা বেগম জানান, টিকটকের একটি কনটেন্টে নিজের হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে দেখতে পেয়ে যশোরে ছুটলেও পুলিশের পক্ষ থেকে আশানুরূপ কোনো সহায়তা মেলেনি। দিনাজপুরের মনিরুজ্জামান মনি তো মুক্তিপণের টাকা দিয়েও ফেরাতে পারেননি ৮ বছরের মেয়ে মানতাশাকে। তবে এই বেদনার মাঝে আশার আলো ছিলেন আজাদ রহমান, যিনি অপহরণের এক বছর পর পুবাইলের সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পুলিশের সাহায্যে ফিরে পেয়েছেন তাঁর সাত বছরের কন্যা আশফিয়াকে।

প্রশাসনের উদ্যোগ ও 'মুন অ্যালার্ট' ব্যবস্থা

নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে দেশে নতুন প্রযুক্তির সংযোজন ঘটেছে। জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. সাদাত রহমান জানান, সিলেটে শিশু মুনতাহা হত্যাকাণ্ডের পর সাধারণ মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সহযোগিতায় 'মুন অ্যালার্ট' (মুনতাহা আর্ট নোটিফিকেশন) এবং '১৩২১৯' টোল ফ্রি হেল্পলাইনের পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যরা অবিলম্বে অমীমাংসিত মামলাগুলোর পুনর্বিবেচনা, নিখোঁজ শিশুদের জন্য জরুরি উদ্ধার ত্বরান্বিত করা এবং শিশু পাচার চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার জোর দাবি জানান।

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা কেবল একটি পরিবারের জীবনকে তছনছ করে না, বরং পুরো সমাজের নিরাপত্তাবোধকে কাঁপিয়ে দেয়। সন্তান হারানোর এই দীর্ঘস্থায়ী শোক ও অনিশ্চয়তা মা-বাবাকে মানসিকভাবে নিঃশেষ করে দেয়। দিনদুপুরে বা বাসার সামনে থেকে শিশু গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা বাড়ার পেছনে সিসিটিভি নজরদারির অভাব, স্থানীয় চক্রগুলোর সক্রিয়তা এবং প্রথম ঘণ্টার 'গোল্ডেন আওয়ারে' উদ্ধার তৎপরতার ধীরগতি দায়ী। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেবল আইনি উদ্যোগ নয়, প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় সামাজিক প্রতিরোধ ও সিসিটিভি মনিটরিং বাড়ানো জরুরি।

— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

মোট ০ প্রতিক্রিয়া

প্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।

প্রকাশক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অপরাধ উন্মোচন
নিউজলেটার

দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান

যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য ()

মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।