পোশাক কারখানায় ‘ভূত আতঙ্ক’: অতিপ্রাকৃত ঘটনা নাকি মনস্তাত্ত্বিক সংকট?

বিশেষ প্রতিবেদক:
কারখানার ভেতরে হঠাৎ কোনো শ্রমিক অসুস্থ হওয়া বা বাথরুমে যাওয়ার পর ‘ভূত’ বা ‘জিনে ধরেছে’ বলে চিৎকার করে অচেতন হয়ে পড়ার ঘটনা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পে নতুন কিছু নয়। গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন বড় বড় রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় এ ধরনের অন্তত ১১টি বড় ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ২২ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় কারখানা ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। প্রশ্ন উঠেছে—কারখানাগুলোতে কি সত্যিই ভূতের প্রাদুর্ভাব ঘটছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন কোনো বাস্তবসম্মত ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ?
সাম্প্রতিক ও অতীতের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক দশকে বেশ কিছু বড় কারখানায় এ ধরনের গণ–অসুস্থতা ও আতঙ্কের ঘটনা ঘটেছে:
ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যার (আগস্ট ২০২৬): নারায়ণগঞ্জের এই কারখানায় দুপুরের খাবারের পর তৃতীয় তলার এক নারী শ্রমিক ‘ভূত’ বলে চিৎকার করে অচেতন হয়ে পড়লে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অর্ধশত শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরদিন সকালেও একই ঘটনা ঘটে।
হপলুন অ্যাপারেলস (টঙ্গী, জুলাই ২০২৬): গত জুলাইয়ে এখানেও একই ধরনের ঘটনায় প্রায় ৬০ জন শ্রমিক অসুস্থ হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারখানা দুই দিন বন্ধ রেখে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
নিউএইজ গ্রুপ (আশুলিয়া, মে ২০২৬): বাথরুমে দুই নারী শ্রমিক অজ্ঞান হওয়ার পর জিন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ১৭২ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঘটনা সামলাতে মিলাদ ও তান্ত্রিক এনে ঝাড়ফুঁক করানোর ঘটনাও ঘটে।
এছাড়া ২০১৫ সালে সাভারের একেএইচ ডায়িং, ২০১৬ সালে আশুলিয়ার ডেকো ডিজাইন ও গাজীপুরের ইউটাহ নিটিং এবং গত বছর এসপি গার্মেন্টস ও গোল্ডেন রিফিট কারখানায় অনুরূপ আতঙ্ক ও শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার নজির রয়েছে।
কেন ঘটছে এমন ঘটনা? বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিকনেতাদের মতে, এ ধরনের ঘটনার পেছনে মূল কয়েকটি কারণ কাজ করছে: ১. মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক চাপ (Conversion Disorder): ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, মানুষের মাথা ঘোরানো, বমি ভাব বা পেটে ব্যথার মতো উপসর্গগুলোকে মনোরোগের ভাষায় ‘কনভারশন ডিসঅর্ডার’ বলা হয়। যখন এই লক্ষণ একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তাকে ‘মাস সাইকোজেনিক ইলনেস’ বা গণমনস্তাত্ত্বিক রোগ বলা হয়। মানসিক চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে এটি হতে পারে। ২. পুষ্টিহীনতা ও কম মজুরি: সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি নাজমা আক্তার ও বিজিআইএসএফের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তারের মতে, কম মজুরির কারণে অনেক শ্রমিক নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেতে পারেন না। ফলে শারীরিক দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ওভারটাইমের ক্লান্তির কারণে তাঁরা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ৩. গুজব ও কুসংস্কার: শ্রমিকদের মধ্যে কুসংস্কার ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ে বিশ্বাস করার প্রবণতা এবং একজনের অসুস্থতা দেখে অন্যদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার মানসিকতা এর অন্যতম প্রধান অনুঘটক।
মালিকপক্ষের আশঙ্কা ও অন্য কোণ
অন্যদিকে পোশাকশিল্প মালিকদের একাংশের ধারণা, এর পেছনে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র থাকতে পারে, যারা পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালায়। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মনে করেন, কারখানায় ভূতের কোনো অস্তিত্ব নেই; এটি সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক এবং সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই কেবল এই সংকট দূর করা সম্ভব।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।