পাকা ফুডকোর্টকে 'খালি জায়গা' দেখিয়ে পানির দরে ইজারা! বনানীতে ডিএনসিসির জমি দখলে তাসলিম সিন্ডিকেট

বৃষ্টি আক্তার, বিশেষ প্রতিবেদক:
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সম্পত্তি বিভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ দুর্নীতির সাম্রাজ্য। প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও রহস্যজনক পৃষ্ঠপোষকতায় সম্পত্তি বিভাগের কর্মী মোহাম্মদ তাসলিম হোসেন ও তাঁর অনুসারী চক্র দীর্ঘ দিন ধরে এই নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গুলশান-বনানীসহ উত্তর সিটির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবৈধ দখল, ইজারা বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির জাল ছড়িয়ে দিয়েছে এই চক্রটি।
পাকা দোকানকে ‘স্পেস’ দেখিয়ে পানির দরে ইজারা
রাজধানীর বনানী কাঁচাবাজার সংলগ্ন এলাকায় ডিএনসিসি নির্মিত পাকা ফুডকোর্টকে কাগজ-কলমে ‘খালি জায়গা’ (স্পেস) দেখিয়ে ৬ মাসের জন্য এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৩৯৮.৭৫ বর্গফুট আয়তনের এই সরকারি জায়গাটিতে প্রতি বর্গফুটের দৈনিক ভাড়া ধরা হয়েছে মাত্র ১ টাকা ৫০ পয়সা। সেই হিসাবে ৩০০ বর্গফুটের একটি দোকানের জন্য মাসিক সরকারি ভাড়া পড়ে মাত্র সাড়ে ১৩ হাজার টাকা।
আইন অনুযায়ী রাজস্ব বিভাগের মাধ্যমে উন্মুক্ত টেন্ডার বা লটারির মাধ্যমে এসব বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও, অনিয়ম করে সম্পত্তি বিভাগ থেকে তা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ইজারার সুবিধা পেয়েছেন বনানী থানা বিএনপির বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন (এম এমজেড এন্টারপ্রাইজ)। সাবেক মেয়র আনিসুল হকের আমলে পার্কিংয়ের পরিত্যক্ত জায়গায় নির্মিত এই পাকা অবকাঠামো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে তাসলিম সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
৩৫-৪২ দোকানের জায়গায় দ্বিগুণ তৈরি: কোটি কোটি টাকার সেলামি বাণিজ্য
কাঁচাবাজার ও সংলগ্ন এলাকায় অনিয়মের পরিধি আরও বিস্তৃত। সিটি করপোরেশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৫ থেকে ৪২টি ক্ষুদ্র দোকানের অনুমোদনের কথা বলা হলেও, সেখানে নকশা ও সীমানা তোয়াক্কা না করে তৈরি করা হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি দোকান। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি অতিরিক্ত দোকান থেকে অবৈধভাবে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘সেলামি’ আদায় করে তা বিক্রি ও হস্তান্তর করা হয়েছে। জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্রটি।
সুপার মার্কেট ও কাঁচাবাজার সংলগ্ন এলাকা দখল: বেপরোয়া পার্কিং বাণিজ্য
অনিয়মের চিত্র এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বনানী সুপার মার্কেট ও কাঁচাবাজারের আশপাশের চলাচলের পথ ও সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধ পার্কিং বাণিজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্বশীলদের নীরবতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ পথচারী ও ব্যবসায়ীদের চলাচলের পথ আটকে প্রতিদিন বেআইনি চাঁদা আদায় করছে এই চক্র।
তালা ভেঙে ক্লাবের জমি দখল ও মালামাল লোপাট
ইজারা ও পার্কিং সিন্ডিকেটের পাশাপাশি প্রকাশ্যে দখলদারির অভিযোগ উঠেছে বনানী রিপোর্টার্স ক্লাবে। কোনো ধরনের আইনি নোটিশ বা আগাম তথ্য না দিয়ে প্রকাশ্যে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মালামাল সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পুরো ক্লাবটি নিয়ন্ত্রণে নেয় চক্রটি।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গোপনে ইজারা প্রক্রিয়ার খবর পেয়ে গত ২৯ জুন তারিখে ডিএনসিসিতে একটি কক্ষের জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয় (ডকুমেন্ট নম্বর: ৬৭৯১)। তবে রহস্যজনকভাবে সেই ফাইল আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে ১৬ জুলাই তারিখে প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি টানা চারদিন ডিএনসিসি কার্যালয়ে সরাসরি গিয়েও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উর্ধ্বতন কারো দেখা মেলেনি। এই বিষয়ে বক্তব্য নিতে ডিএনসিসি প্রশাসকের সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রশাসনের নীরবতা ও ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা
সম্পত্তি বিভাগের নকশা কিংবা ফাইল আটকে রেখে অর্থ আদায়ের কৌশল এই চক্রের নখদর্পণে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অফিসে সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও নেপথ্যে থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। প্রকাশ্যে সরকারি জমি ও দোকান বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা চালানোয় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।