ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের নেপথ্য কারণ

২০২৬ সালের ২৫ জুলাই ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিছক কোনো রাজনৈতিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি ভারতীয় তরুণ প্রজন্মের দমন-পীড়ন ও তকমা-রাজনীতিকে অকার্যকর করে দেওয়ার এক নতুন ‘রাজনৈতিক ব্যাকরণের’ জয়। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এক মন্তব্যের পর বিজেপিকে ব্যঙ্গ করে গঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) মাত্র কয়েক দিনে ২ কোটির বেশি অনুসারী জোগাড় করে ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
১. রাষ্ট্রের পুরোনো 'তকমা দাগানোর' অস্ত্র ভোঁতা হওয়া
বিজেপি সরকারের অতীত ইতিহাসে দেখা গেছে—শাহিনবাগের আন্দোলনকে ‘মুসলিম-পক্ষপাত’, জেএনইউ-যাদবপুরের আন্দোলনকে ‘আরবান নকশাল’ কিংবা কৃষক আন্দোলনকে ‘খালিস্তানি’ ট্যাগ দিয়ে মূলধারার জনমত থেকে বিচ্ছিন্ন করা যেত। কিন্তু সিজেপির ক্ষেত্রে এই কৌশল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। কারণ, যন্তর মন্তর ও রাজপথে কোনো পরিচিত বাম বা ধর্মীয় সংগঠন ছিল না; আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল কোচিং সেন্টারের সাধারণ ছাত্র, মধ্যবিত্ত পরিবারের নতুন স্নাতক ও গিগ-ইকোনমির কর্মীরা। এরা প্রতিদিন মোবাইল অ্যাপ, ডিজিটাল পেমেন্ট ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির অংশ—ফলে এদের 'জিহাদি' বা 'নকশাল' তকমা দিয়ে জনবিচ্ছিন্ন করা রাষ্ট্রের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
২. স্বাধীন দৃশ্য-সাংবাদিকতা ও ভয়ের ভাষা অকার্যকর হওয়া
আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত স্মার্টফোন ক্যামেরা রাষ্ট্রের একতরফা ন্যারেটিভ বা প্রচারযন্ত্র ভেঙে দেয়। বিশেষ করে ইউটিউব চ্যানেল ‘আনফিল্টার্ড বাই সামদিশ’-এর সাংবাদিক সামদিশ ভাটিয়ার সরাসরি কভারেজ এবং তাঁর উচ্চারিত—‘ক্যামেরাপারসন পার্থ, দেখাইয়ে’ কথাটি আন্দোলনের বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে ওঠে। অ্যাপ-নির্ভর যুগে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্ম তাৎক্ষণিক জবাবদিহিতায় অভ্যস্ত। রাষ্ট্রের লাঠি, টিয়ারশেল, বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ কিংবা কালি ছিটানোর মতো ঘটনা উল্টো সাধারণ মানুষের সহানুভূতি বাড়িয়ে দেয়।
৩. রেকর্ড বেকারত্ব ও ক্ষোভের নিরেট অর্থনৈতিক বাস্তব ভিত্তি
এই আন্দোলনের মূল ফুয়েল বা জ্বালানি জুগিয়েছে দেশের শোচনীয় অর্থনৈতিক চিত্র। ভারতের জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে তরুণদের (১৫-২৯ বছর) বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১৬.২ শতাংশে (যা ২০২৫ সালের এপ্রিলে ছিল ১৩.৮%)। এদের দুই-তৃতীয়াংশই স্নাতক ডিগ্রিধারী। এনটিএ (NTA)-র ক্রমাগত প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সিবিএসই (CBSE)-র মূল্যায়ন জালিয়াতি মেধাতন্ত্রকে ধসিয়ে দিলে কোটি কোটি শিক্ষিত চাকরিপ্রত্যাশী তরুণের সঞ্চিত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। ২০২৪ সালে যেখানে এটি ছিল শুধুই সংসদকেন্দ্রিক প্রতিবাদ, ২০২৬ সালে তা রূপ নেয় সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে।
সোনম ওয়াংচুকের অনশন ও নতুন রাজনৈতিক শিক্ষা
লাদাখের সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ষষ্ঠ তফসিল ও রাজ্যের মর্যাদার দাবিতে টানা ২১ ও ৩৫ দিন অনশন করেও সরকারের কাছ থেকে আংশিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছু পাননি। কিন্তু এবার সিজেপির পাশে দাঁড়িয়ে মাত্র ২৬ দিনের অনশনেই কেন্দ্রকে বাধ্য করেন। এটি প্রমাণ করে—দীর্ঘ ও একলা আত্মত্যাগের ধীরগতির রাজনীতির চেয়ে দ্রুত, সমষ্টিগত, তথ্য-স্বচ্ছতা ও ব্যঙ্গাত্মক নাগরিক আন্দোলন রাষ্ট্রকে দ্রুত জবাবদিহির টেবিলে টেনে আনতে অনেক বেশি কার্যকর।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।