মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
অপরাধ উন্মোচন
অপরাধ

আইসিটি বিভাগে আওয়ামী চক্র পুনর্বাসনের অভিযোগ, বদলি বাতিল ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য।

১০-০৯-২০২৬
4
আইসিটি বিভাগে আওয়ামী চক্র পুনর্বাসনের অভিযোগ, বদলি বাতিল ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কালিয়াকৈর ও রাজশাহী হাই-টেক পার্কের ফাইল ছবি; যেখানে জমি বরাদ্দ, প্রকিউরমেন্ট ও কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের অধীন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ‘আওয়ামী চক্র’ পুনর্বাসনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বৈষম্যবিরোধী অবস্থানের কর্মকর্তাদের টার্গেট করে ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া এবং ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের সুবিধাজনক স্থানে বহাল রাখার পেছনে প্রভাবশালীদের ইন্ধন কাজ করছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোটি কোটি টাকার প্রকিউরমেন্ট, জমি বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

বদলি আদেশ বাতিল ও কর্মকর্তাদের অসন্তোষ

সম্প্রতি তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও বর্তমানে হাই-টেক পার্কের কর্মকর্তা মনির হোসেনকে চট্টগ্রাম সফটওয়্যার পার্কে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে প্রশাসনিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপটে মাত্র দুই দিনের মাথায় তার বদলি আদেশ বাতিল করা হয়। অন্যদিকে কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করা কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে উল্টো চট্টগ্রামে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যশোর থেকে রাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মাহফুজুল কবীরকে প্রকিউরমেন্ট শাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এই ঘটনায় সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

উপ-পরিচালক মাহফুজুল কবীরের ফাইল ও অনিয়ম

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহফুজুল কবীর ২০১১ সালে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। তৎকালীন আইসিটি সচিব এন আই খানের সময়ে তিনি দ্রুত ডিডি (প্রকিউরমেন্ট) পদে পদোন্নতি পান। পরবর্তীতে তিনি কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্ক প্রকল্পের ফোকাল পয়েন্টের দায়িত্ব পেয়ে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন।

  • কালিয়াকৈর প্রকল্প ও মাস্টারপ্ল্যান: অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় স্থপতি ইকবাল হাবিবের কোম্পানিকে মাস্টারপ্ল্যানের কাজ দিয়ে বিপুল অর্থ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

  • অসম পিপিপি চুক্তি: সামিট গ্রুপ (৯১ একর) ও ফাইবার এট হোম-এর টেকনোসিটি লিমিটেডকে (৪৩ একর) জমি বরাদ্দে চুক্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখেন মাহফুজ। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি টাকায় অভ্যন্তরীণ মৌলিক অবকাঠামো বানিয়ে দিয়ে এসব সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়।

অন্যান্য চুক্তি ও নিয়োগ: যশোর সফ্টওয়্যার টেকনোলজি পার্কের প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি হিসেবে ওয়াহিদ শরীফের ডিজিকন লিমিটেডকে (টেকসিটি) নিয়োগের নেপথ্যেও তার নাম উঠে এসেছে।

বেসরকারি হাই-টেক পার্ক ও ঘুষ বাণিজ্য: সাবেক এমডি হোসনে আরা বেগমকে প্রভাবিত করে অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে ১২টি বেসরকারী হাই-টেক পার্ক ঘোষণার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া কালিয়াকৈরে প্রতি একরে ৫-৭ লাখ টাকা অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

  • অন্যান্য অভিযোগ ও সম্পদ অর্জন: সাবেক এমডি বিকর্ণ কুমার ঘোষের মেয়াদে বাটারফ্লাই কোম্পানির কাছ থেকে ৫০ লাখ, ওরিক্স বায়ো-টেক থেকে ১.৫ কোটি এবং নাজ-ডাক থেকে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া সহকারী পরিচালক থাকা অবস্থাতেই তিনি মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান হাউজিংয়ে ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ি কেনেন। সরকারি খরচে তিনি ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, যার মধ্যে ৫ বার যুক্তরাষ্ট্র সফর অন্তর্ভুক্ত।

রাজশাহীতে ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ ও পিডির কর্মকাণ্ড

গত ৫ আগস্টের পর রাজশাহী হাই-টেক পার্কে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। মাহফুজুল কবীরের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে সেখানে ৩২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি দেখানো হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নতুন তদন্তে দেখা যায়, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩-৪ কোটি টাকা।

এছাড়া রাজশাহী প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) নুরুল ইসলাম বিপুল অর্থ অর্জনের মাধ্যমে প্রায় ৭ কোটি টাকা দিয়ে জমি ও বাড়ি নির্মাণ করেছেন বলে কথিত রয়েছে। প্রকল্পের পিডি ও ডিপিডির জন্য ভাড়ায় নেওয়া শহরের বাসার ৪ লাখ টাকার আসবাবপত্রের হিসাবও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

সহকারী পরিচালক মনিরের ভুয়া বিল ও দালালি

সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের সুপারিশে ২০১৪ সালে রিসেপশনিস্ট পদে যোগ দেন তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক মনির হোসেন। তিনি গত ১২ বছর ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

জাল স্বাক্ষর ও মালামাল চুরি: অফিসে নির্ধারিত কাজের বদলে ইনভেস্টর লাউঞ্জে বসে মধ্যস্থতা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, অন্যের স্বাক্ষর নকল করে সম্মানীর টাকা তোলা এবং স্টোরের মালামাল চুরির কারণে তাকে একবার প্রশাসনিকভাবে স্টোরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।

  • পদোন্নতির চেষ্টা: তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্তের দাবি উঠলেও, একটি প্রভাবশালী গ্রুপ তাকে পদোন্নতি দেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলে সাধারণ কর্মীরা আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।

ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অভিযোগ তুলেছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও হাই-টেক পার্কের নিয়ন্ত্রণ এখনও সাবেক মন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের দোসর, এপিএস রঞ্জিত, পিও একরাম ও ক্যাশিয়ার মিলনদের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের হাতেই রয়ে গেছে। অবিলম্বে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং বিতর্কিতদের প্রশাসনিক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

মোট ০ প্রতিক্রিয়া

প্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।

প্রকাশক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অপরাধ উন্মোচন
নিউজলেটার

দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান

যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য ()

মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।