হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও নারী হেনস্তার অভিযোগ: সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন

বিশেষ প্রতিবেদক, অপরাধ উন্মোচন
বদলি-বাণিজ্য, কমিশন ও ঘুষ লেনদেন, পদায়ন সিন্ডিকেট এবং প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে এক অসহায় নারীকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা, মানসিক নির্যাতন ও অশোভন আচরণের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অপকর্মের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের এই নীরবতার সুযোগে তিনি দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অসহায় নারীকে হেনস্তা ও অশোভন আচরণের অভিযোগ
সামাজিক ও পারিবারিক অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে এক নারীর সঙ্গে অশালীন আচরণ ও নানা অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে আসছেন বলে সাপ্তাহিক ‘অপরাধ উন্মোচন’-এর কাছে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী নারী। অসদাচরণের প্রতিবাদ করায় তাঁকে ভয়ভীতি ও নানা ধরনের হুমকি প্রদর্শন করা হচ্ছে। লোকলজ্জা এবং প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে এতদিন মুখ না খুললেও চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে তিনি প্রতিকার চেয়েছেন।
ভুক্তভোগী নারী জানান, “আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মাইকেল মহিউদ্দিন ক্রমাগত অশোভন আচরণ ও মানসিক নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবাদ করায় উল্টো হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছি।” এ ঘটনায় তিনি স্থানীয় থানা, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত দপ্তরে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
আফতাবনগরে ২৯টি ফ্ল্যাট ও গুলশানে বিলাসবহুল আবাসন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে মাইকেল মহিউদ্দিন গড়ে তুলেছেন বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। রাজধানীর আফতাবনগরের একটি ভবনেই তাঁর ২৯টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে, যার প্রতিটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
এছাড়া গুলশান-১-এর ৭ নম্বর রোডের কোহিনুর টাওয়ারে দুটি ফ্লোর জুড়ে রয়েছে তাঁর নিজস্ব ডুপ্লেক্স বাসস্থান এবং একই এলাকার গ্রিন ভিউ অ্যাপার্টমেন্টে ১২ কোটি টাকার বেশি মূল্যের আড়াই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। গুলশান ও নিকেতন এলাকার বিভিন্ন রোডে তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট ও শ্যালকের নামে থাকা বেনামি সম্পত্তির হদিস পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী জান্নাত নীলার নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ধানমন্ডি ও গুলশানে একাধিক মূল্যবান প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। নিজ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর নামে বিশাল কৃষিজমি ও খামারের সন্ধানও মিলেছে।
বদলি-বাণিজ্য ও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট
নিবন্ধন অধিদপ্তরে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২৮২ জন কর্মকর্তার বদলিতে জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেন হয়েছে। পাশাপাশি লাভজনক কর্মস্থলে বহাল থাকতে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ২০-৩০ জনের একটি নিজস্ব চক্র তৈরি করে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এর আগে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে একটি বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানের জমি নিবন্ধনে বড় অঙ্কের সরকারি রাজস্ব ফাঁকি ও দুই কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের ঘটনা প্রকাশ পায়। ওই ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর মধ্যরাতে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা কার্যালয়ে গিয়ে সংবাদ প্রত্যাহারের জন্য হুমকি ও চাপ দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
দুদকে লিখিত অভিযোগ ও তদন্তের দাবি
মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে বদলি-বাণিজ্য, দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাফসান আল আলভী। তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির প্রকৃত উৎস উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নারীর প্রতি অশোভন আচরণের ঘটনায় দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জনস্বার্থে অনুসন্ধানী তথ্য আহ্বান:
দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, চাঁদাবাজি কিংবা অসহায় মানুষের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনস্বার্থে আমাদের অনুসন্ধান চলমান থাকবে। যেকোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির তথ্য দিয়ে সাপ্তাহিক ‘অপরাধ উন্মোচন’-কে সহযোগিতা করুন। তথ্য প্রদানকারীর নাম ও পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।
তথ্য পাঠানোর হটলাইন: 01714890808
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।