শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
অপরাধ উন্মোচন
nationwide

ঘুষ বাণিজ্যে শতকোটি টাকার সাম্রাজ্য, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুলের দুর্নীতির গোপন খতিয়ান

২৫-১০-২০২৬১৬০
4
ঘুষ বাণিজ্যে শতকোটি টাকার সাম্রাজ্য, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুলের দুর্নীতির গোপন খতিয়ান
"ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় এবং দুর্নীতির প্রতীকী ছবি।"

​বাইরে থেকে দেখলে পরিপাটি ও মার্জিত এক সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু সেই আড়ালেই গড়ে উঠেছে দুর্নীতির এক অদৃশ্য রাজত্ব। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের সন্তান ও ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার (ডিআর) শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে এবার সামনে এলো ঘুষ বাণিজ্য, জাল দলিল সিন্ডিকেট এবং নামে-বেনামে শতকোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তোলার চাঞ্চল্যকর তথ্য।

​প্রতি মাসে কোটি টাকার ‘নাস্তা খরচ’ সিন্ডিকেট

ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের অধীনে সদর রেকর্ডরুমসহ মোট ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস পরিচালিত হয়। উত্তরা, খিলগাঁও, বাড্ডা, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, সূত্রাপুর, গুলশান, ধানমন্ডি, পল্টন, মিরপুর, ডেমরা, শ্যামপুর, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়াসহ এই ২১টি অফিসে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার দলিল সম্পাদিত হয়।

​অনুসন্ধানে প্রকাশ, জেলা রেজিস্ট্রারের নির্দেশে তাঁর বিশেষ সহকারীর মাধ্যমে প্রতি দলিলের বিপরীতে তথাকথিত ‘নাস্তা খরচ’ বাবদ বাধ্যতামূলকভাবে আদায় করা হয় আড়াই হাজার টাকা। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ জমি ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়; টাকা না দিলে দলিল বাতিলের হুমকি মেলে। কেবল এই খাত থেকেই প্রতি মাসে তাঁর পকেটে ঢোকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থ। এছাড়া প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের তথ্যও উঠে এসেছে।

​উত্থানের নেপথ্যে প্রভাব ও তদবির

শফিকুল ইসলামের এই দুর্নীতির হাতেখড়ি মেহেরপুর সদর ও ঝিনাইদহের মহেশপুরে সাব-রেজিস্ট্রার থাকাকালে। পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের লেনদেনের বিনিময়ে তদবির করিয়ে ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নাটোরের জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি ও পদায়ন নেন। সেখানে যোগদানের পর থেকেই তাঁর ঘুষের নেটওয়ার্ক অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।

​অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব দমনের উদ্দেশ্যে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ক্যাডারদের সাথে গভীর রাতে চক্রান্ত ও অর্থায়নে যুক্ত ছিলেন তিনি। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর নিবন্ধন অধিদপ্তরের (আইজিআর) অনুমতি ছাড়াই দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে আত্মগোপন করেন। পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে এলে ফরিদপুরে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে শীর্ষ পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে বাগিয়ে নেন লোভনীয় ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের পদ।

​চার জেলা জুড়ে সম্পদের পাহাড়

অনুসন্ধানে শফিকুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত মিলেছে:

​ঢাকা: রাজধানীর কল্যাণপুরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ২ নম্বর রোডের ‘ড্রিম হেভেন’ ভবনে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। এছাড়া মোহাম্মদপুরে রয়েছে একটি বাড়ি।

​চুয়াডাঙ্গা ও নিজ গ্রাম: চুয়াডাঙ্গা শহরের কাঠপট্টি এলাকায় চারতলা বাড়ি, কার্পাসডাঙ্গা বাজারে চারতলা মার্কেট ভবন, আট কবর এলাকায় মার্কেটসহ দোতলা বাণিজ্যিক ভবন এবং দামুড়হুদার জগন্নাথপুর নিজ গ্রামে গড়ে তুলেছেন আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি।

​যশোর, ঝিনাইদহ ও মেহেরপুর: যশোর ও ঝিনাইদহ শহরে একাধিক বাড়ি ছাড়াও মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস গ্রামে নিজের ভাইয়ের নামে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি কিনেছেন।

​ব্যবসা ও বিলাসিতা: ভাগ্নে মো. হুমায়ুন আহমেদের নামে পরিচালনা করছেন কোটি টাকা মূলধনের ‘নেহা ত্বহা ট্রেডার্স’। চলাচলে ব্যবহার করেন বিলাসবহুল গাড়ি; স্ত্রী সুরাইয়া ইসলামের নামে রয়েছে ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৬১৬৬ নম্বরের দামি প্রাইভেট কার। দুই ছেলে মাহি ও মুহিতের নামেও বেনামি সম্পদের খোঁজ চলছে। এছাড়া দুর্নীতির অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে একাধিক বেনামি ব্যাংক হিসাব।

​সন্ত্রাসী উমেদার সিন্ডিকেট ও সাংবাদিক নির্যাতন

অনিয়ম ঢাকতে রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে গড়ে তোলা হয়েছে বিতর্কিত উমেদার বাহিনী। গত ৯ সেপ্টেম্বর পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় মোহাম্মদপুর অফিসের ওমেদার আওলাদ (ওরফে ব্লেট আওলাদ), সদর অফিসের রাসেল (ওরফে পটু রাসেল), লম্বু রাসেল, কামাল ও পল্লবীর ব্লেট রাজিবসহ চিহ্নিত একদল উমেদার। গুরুতর এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের প্রত্যক্ষ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে জেলা রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে।

​দুদকে অভিযোগের পাহাড়, নেপথ্যে ফাইল ধামাচাপা

ঘুষ, অনিয়ম ও অসদাচরণের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রক্রিয়া ভিন্ন খাতে নিতে বিপুল অর্থ ঢেলে ফাইল আটকে রাখার চেষ্টা চলছে। সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতি সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে অফিস ত্যাগের সময় তাঁর কার্যালয়ে নজরদারি করলেই হাতেনাতে কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন শনাক্ত করা সম্ভব।

​উত্থাপিত দুর্নীতির বিষয়ে জানতে শফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

​ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতির গোপন জাল আর অপরাধ জগতের এমন আরও চাঞ্চল্যকর অধ্যায় উন্মোচনে চোখ রাখুন। অপরাধ উন্মোচন-এর ২য় পর্বের অনুসন্ধান চলমান থাকবে

— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন

আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

মোট ০ প্রতিক্রিয়া

প্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।

প্রকাশক
নিজস্ব প্রতিবেদক
অপরাধ উন্মোচন
নিউজলেটার

দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান

যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।