বিষাক্ত গ্যাসে ঝরল ৯টি প্রাণ! সীতাকুণ্ডের সেই বিতর্কিত শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড নিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে অবস্থিত জাহাজভাঙা কারখানা ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড’-এ বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর কারখানাটির সব ধরনের কার্যক্রম এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ শনিবার রাত ৯টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন।
শিল্প সচিবের পরিদর্শন ও তদন্ত স্বার্থে কারখানা বন্ধ
বিএসবিআরএ সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুন নাসের খান দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পরেই এই স্থগিতাদেশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মূলত দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি যেন নিরাপদে নমুনা সংগ্রহ করতে পারে, সে কারণেই সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। তদন্তের কাজ চলাকালে যাতে নতুন করে আর কোনো অপ্রীতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতেই এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
ঠিক কী ঘটেছিল ‘এমটি রাসি’ জাহাজে?
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে। ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে রাখা ‘এমটি রাসি’ নামের একটি ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের স্ক্র্যাপ জাহাজে কাজ করছিলেন একদল শ্রমিক। কাজ করার সময় হঠাৎই জাহাজের ভেতরে জমে থাকা মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন তারা। পরবর্তীতে একে একে ৯ জন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু ঘটে। দুর্ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রাথমিক তদন্ত শেষে জানিয়েছেন, জাহাজের 'ব্যালাস্ট' এলাকায় অতিমাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার কারণেই এই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে।
আগেই ছিল নিরাপত্তা ঘাটতি ও মামলা, তবুও নেওয়া হয়নি শিক্ষা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ইয়ার্ডটিতে নিরাপত্তার ঘাটতি নতুন কিছু নয়। চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারিতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) এই কারখানায় পরিদর্শন চালিয়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার চরম অনিয়ম উন্মোচন করে। শ্রমিকদের যথাযথ সুরক্ষা সরঞ্জাম না দেওয়া, ঝুঁকি মূল্যায়নের রিপোর্ট জমা না দেওয়া এবং অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়েও ওভারটাইমের টাকা না দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল। এসব সংশোধনের জন্য বারবার নোটিশ দেওয়া হলেও কোনো জবাব না দেওয়ায় গত জুলাইয়ে কারখানাটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলাও দায়ের করে অধিদপ্তর। অথচ সেই অবহেলার মাশুল শেষমেশ দিতে হলো ৯ জন সাধারণ শ্রমিককে।
শ্রমিকের জীবন ও মুনাফার হিসাব
সমাজবিজ্ঞানী ও শ্রমিক অধিকার কর্মীদের মতে, আমাদের দেশের শিপ ব্রেকিং শিল্পে প্রায়শই নিরাপত্তার চেয়ে আর্থিক মুনাফাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। পূর্বের অনিয়ম ও আদালতের মামলাকে তোয়াক্কা না করার পেছনে রয়েছে প্রশাসনের তদারকির অভাব এবং মালিকপক্ষের বেপরোয়া মানসিকতা। প্রতিবারই বড় কোনো দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং সাময়িক বন্ধের নির্দেশ আসে, কিন্তু টেকসই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অবকাঠামোগত পরিবর্তন খুব কমই চোখে পড়ে। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং কাজের শতভাগ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না করা গেলে এই ধরণের 'মৃত্যুকূপ' বন্ধ করা সম্ভব নয়।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।