কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ৭ বাংলাদেশিসহ নিহত ৯, তদন্তে পৌরমণ্ডলী ও পুলিশ

কলকাতা প্রতিনিধি পশ্চিমবঙ্গ
কলকাতার ব্যস্ততম মির্জা গালিব স্ট্রিটের 'শিখা ইন্টারন্যাশনাল' নামের একটি আবাসিক হোটেলে গভীর রাতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৯ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক দুটোর দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তখন হোটেলের অতিথি ও সাধারণ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ ভবনে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়। এই ঘটনায় আরও অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ততক্ষণে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে অনেকের মৃত্যু হয়।
একই পরিবারের চারজনসহ নিহতের করুণ তালিকা
মারা যাওয়া সাতজন বাংলাদেশির মধ্যে কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন—দেবাশীষ দত্ত (৩৯), তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), তিন বছরের শিশুপুত্র শর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬০)। তারা মাত্র ১৫ দিন আগে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে গিয়েছিলেন। এছাড়া ঢাকার সাভারের বাসিন্দা আহমেদ বাবু (৩৭) এবং সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের দুই বাসিন্দা এস এম আলিমুজ্জামান ও রেবতী সরকার প্রাণ হারিয়েছেন। বাকি দুজনের মধ্যে একজন ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা হোটেল কর্মচারী সন্দীপ পাশওয়ান এবং অন্যজন শিলিগুড়ির যোগনারায়ণ আগরওয়াল (৬৮)।
নিরাপত্তাহীন ঘুপচি হোটেল ও নথিপত্রের গরমিল
ঘটনার পর সরেজমিন দেখা গেছে, হোটেলটির প্রবেশপথ অত্যন্ত অপ্রশস্ত এবং ভেতরে পুরোনো ধাঁচের সরু পেঁচানো সিঁড়ি ছাড়া বের হওয়ার কোনো বিকল্প ফায়ার এক্সিট ব্যবস্থা ছিল না। ভবনের পেছন দিকটিও কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে রাখা। স্থানীয়দের দাবি, এই অঞ্চলে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা পর্যটকদের টার্গেট করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অনুমোদনহীন হোটেল গড়ে ওঠে। ফায়ার সার্ভিস ও কলকাতা পৌরসভার প্রাথমিক ধারণানুযায়ী, হোটেলটির যথাযথ বৈধ কাগজপত্র বা অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র ছিল না। ইতোমধ্যে হোটেলটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং জমির মালিককে পুলিশ আটক করেছে।
রাজনৈতিক চড়াও ও পৌরসভার কড়া তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনাকে "দীর্ঘদিনের গাফিলতি ও উদাসীনতার ফল" আখ্যা দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অন্যদিকে নগর উন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রেড লাইসেন্স বা ফায়ার পারমিশন ছাড়া কীভাবে এই ধরনের হোটেলে বিদ্যুৎ সংযোগ ও পরিচালনা অব্যাহত ছিল। পুরো কলকাতার সকল বাণিজ্যিক কাঠামোর অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
প্রতীক্ষার অবসান ও সামাজিক সতর্ক বার্তা
যে আশার আলো নিয়ে বাংলাদেশিরা চিকিৎসার তাগিদে সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় গিয়েছেন, সেই আশা এমন এক ট্র্যাজেডিতে শেষ হবে—তা ভাবতেও শিউরে উঠছে স্বজনেরা। অনুমোদনহীন ও অনিরাপদ ঘুপচি হোটেলগুলোর ব্যবসায়িক লোভের বলি হতে হলো সাধারণ অসহায় মানুষকে। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির বড় ধরণের গাফিলতি উন্মোচন করে দিয়েছে। ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কঠোর তদারকি সুনিশ্চিত করা এখন সময়ের বড় দাবি।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।