সারায়েভো হত্যাকাণ্ডে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা: ইতিহাস ও পেছনের সমীকরণ
Growth at 11%.

১৯১৪ সালের ২৮ জুন, বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোর রাস্তায় ঘটা এক চাঞ্চল্যকর ট্র্যাজেডি বদলে দিয়েছিল গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফিকে রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৯ বছর বয়সী তরুণ গ্যাভরিলো প্রিন্সিপের ছোঁড়া সেই দুটি গুলিই যেন বারুদের স্তূপে আগুনের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছিল। এই হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় মাত্র এক মাসের মাথায়, অর্থাৎ ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।
যে কারণে বলকানের টার্গেট ছিলেন ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ
১৮৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করা ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের ভাতিজা। পর পর দুটি রহস্যজনক মৃত্যু ও অসুস্থতার কারণে অপ্রত্যাশিতভাবেই তিনি রাজ সিংহাসনের প্রধান উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠেন। ১৯০৮ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য যখন জোরপূর্বক বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে, তখন থেকেই স্থানীয় স্লাভ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। বিশেষ করে সার্ব জাতীয়তাবাদীরা, যারা বলকান অঞ্চলে 'গ্রেটার সার্বিয়া' গড়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল, তারা এই দখলদারিত্ব মেনে নিতে পারেনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বসনিয়ার কাঠ লুটে নেওয়ার অভিযোগ। সেই ক্ষোভ থেকেই সার্ব তরুণ গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ ও তাঁর সঙ্গীরা যুবরাজকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা আঁকেন।
ব্যাটলগ্রাউন্ড সারায়েভো: প্রথম ব্যর্থতা ও দ্বিতীয়বারের ধাক্কা
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, সারায়েভো সফরে গিয়ে প্রথমবার অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন যুবরাজ ফার্দিনান্দ। তাঁদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হলেও তিনি ও তাঁর স্ত্রী সোফি অলৌকিকভাবে অক্ষত থাকেন। কিন্তু সেই আতঙ্কের পরও সফর বাতিল করেননি যুবরাজ। আর তাতেই ঘটে চরম বিপত্তি। একই দিন অন্য একটি পথ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তাঁদের গাড়ির ঠিক সামনে এসে দাঁড়ান হামলাকারী গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ। খুব কাছ থেকে চালানো তাঁর দুটি গুলি মুহূর্তেই কেড়ে নেয় রাজদম্পতির প্রাণ। গ্রেপ্তারের পর প্রিন্সিপ জানান, স্লাভ জনগণকে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় নিপীড়ন থেকে মুক্ত করতেই তিনি এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। বয়স ২০ বছরের কম হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড এড়িয়ে তাঁর ২০ বছরের কারাদণ্ড হয়, তবে কারান্তরালেই ১৯১৮ সালে যক্ষ্মায় মারা যান তিনি।
জোটের রাজনীতি ও কূটনৈতিক অঙ্কের মারাত্মক ভুল
হত্যাকাণ্ডের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরি এই ঘটনার পেছনে সার্বিয়া সরকারকে দায়ী করে ২৩ জুলাই ১০ দফার কঠোর আল্টিমেটাম দেয়। নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের শর্তটি ছাড়া বাকি সব মেনে নেয় সার্বিয়া। ইতিহাসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাশিয়া তাদের পাশে দাঁড়াবে—এমন আত্মবিশ্বাস থেকেই সার্বিয়া ওই এক শর্তে অনড় থাকে। বিশ্বখ্যাত অ্যালবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রিচার্ড ফোগার্টি বিষয়টিকে ব্যাখ্য দিয়ে জানান, "উভয় পক্ষই ভেবেছিল তাদের শক্তিশালী মিত্রদের উপস্থিতির কথা জানিয়ে যুদ্ধ এড়ানো যাবে।" কিন্তু সেই কূটনৈতিক সমীকরণ উল্টে গিয়ে উল্টো বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে দেয়। ট্রিপল অ্যালায়েন্স (জার্মানি, অস্ট্রো-হাঙ্গেরি, ওসমানীয় সাম্রাজ্য) এবং ট্রিপল আন্তঁত (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র)-এর সামরিক চুক্তির ফলে দেখতে দেখতে পুরো ইউরোপ দুই খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
মহাযুদ্ধের সমাপ্তি, সাম্রাজ্যের পতন ও বিশ্বব্যবস্থার বদল
দীর্ঘ চার বছরের রক্তাক্ত লড়াই, ট্যাঙ্কের মতো নতুন সামরিক প্রযুক্তির উন্মেষ এবং কোটি কোটি মানুষের মৃত্যুর পর ১৯১৮ সালে ওয়াইমার প্রজাতন্ত্র গঠিত হলে জার্মানি বিশ্বযুদ্ধে হার স্বীকার করে। ১৯১৮ সালের ১১ই নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে থেমে যায় কামানের গর্জন। তবে এর ফলে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা উসমানীয় সাম্রাজ্য, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য এবং রাশিয়ার রোমানভ সাম্রাজ্যের মতো অতিকায় শক্তির নাম।
ইতিহাসের গভীর মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আমাদের শেখায় কীভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদ, অস্ত্রের অন্ধ প্রতিযোগিতা এবং জোট রাজনীতির কারণে সামান্য একটি আঞ্চলিক সংকট মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। ইতিহাসবিদদের মতে, সারায়েভোর ট্র্যাজেডি কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়, এটি মূলত তৎকালীন বিশ্বনেতাদের ভুল সিদ্ধান্ত ও অহংকারের এক চরম মাশুল, যার ক্ষত পৃথিবীকে বহু দশক ধরে বইতে হয়েছিল।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।